কাগজে অগ্রগতি দিয়ে নয়, বাস্তবে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করুন
- আপলোড সময় : ২৪-০২-২০২৬ ১২:২০:৩৫ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৪-০২-২০২৬ ১২:২০:৩৫ পূর্বাহ্ন
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের কাজ নিয়ে প্রতি বছরই শঙ্কা, অভিযোগ ও পাল্টা দাবির পুনরাবৃত্তি ঘটে। চলতি মৌসুমেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নির্দেশিকা ফলকে কাজ শেষের তারিখ ২৮ ফেব্রুয়ারি উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে অনেক বাঁধে এখনও মাটির কাজ চলমান, একাধিক ক্লোজারের গোড়ায় দৃশ্যমান ভাঙন, কোথাও ধসের আলামত - সব মিলিয়ে হাওরবাসীর মনে উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
সরকারি হিসাব বলছে এক কথা, মাঠের চিত্র বলছে আরেক। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) দাবি করছে ৭২ থেকে ৭৪ শতাংশ কাজ স¤পন্ন হয়েছে; ক্লোজারের কাজও নাকি ৮০ শতাংশের বেশি শেষ। কিন্তু বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা বাস্তবতা বলছে, অনেক প্রকল্পে কাজ অস¤পূর্ণ, কোথাও শ্রমিক নেই, কোথাও বা দায়সারা মাটি ফেলে রাখা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানগত ফারাকই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- কাগজে-কলমে অগ্রগতি আর বাস্তবের অগ্রগতি কি এক?
হাওরের বাঁধে ‘ক্লোজার’ বা ভাঙা মুখই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ। সেখানে টেকসই ব্যবস্থা- বাঁশ-বস্তা, জিওব্যাগ, শক্ত মাটির স্তর - অবশ্যক। অথচ একাধিক স্থানে দেখা গেছে, ভাঙনের গোড়ায় সামান্য মাটি ফেলে দায় সারা হয়েছে। কোথাও ধসে পড়ার উপক্রম, কোথাও ফাটল।
হাওরবাসী জানেন, একটি ক্লোজার ভেঙে গেলে হাজার হাজার একর বোরো ফসল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তলিয়ে যেতে পারে। সুনামগঞ্জের ১৩৪টি হাওরে প্রায় সোয়া দুই লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়। কৃষকের সারা বছরের ঘাম-শ্রম, ঋণ ও আশা - সবই নির্ভর করে এই কয়েক মাসের নিরাপত্তার ওপর।
এ অবস্থায় ভারি বৃষ্টিপাত বা উজানের পাহাড়ি ঢল নামলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে - এই শঙ্কা অমূলক নয়, বরং অভিজ্ঞতালব্ধ বাস্তবতা।
এদিকে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) অনেকেই অভিযোগ করছেন, বিলের অর্থ ছাড়ে দেরি হচ্ছে। কোথাও ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও ১৫ শতাংশ বিল পেয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থপ্রবাহে জট থাকলে মাঠপর্যায়ে কাজের গতি কমবে - এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কাজের নির্ধারিত সময় যখন আগেই জানা, তখন অর্থছাড়ের প্রক্রিয়া কেন এমন ধীর? প্রকল্প অনুমোদন, বরাদ্দ, বিল পরিশোধ - সব কিছুতেই যদি শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়ো থাকে, তবে গুণগত মান নিশ্চিত হবে কীভাবে?
হাওর বাঁচাও আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠন বলছে, প্রকৃত অগ্রগতি ৪০ থেকে ৪২ শতাংশের বেশি নয়। তাদের আশঙ্কা, অনিয়ম ও অবহেলার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে দুর্যোগ এলে দায় এড়ানো হবে, কিন্তু ক্ষতি বইবে কৃষক।
এই অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার আগে কর্তৃপক্ষের উচিত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। প্রকল্পভিত্তিক অগ্রগতির তথ্য, অর্থছাড়ের অবস্থা, ক্লোজারের ঝুঁকির তালিকা - সবই প্রকাশ্যে আনা যেতে পারে। স্থানীয় কৃষক প্রতিনিধি, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে নিয়ে যৌথ মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করলে বিভ্রান্তি কমবে।
প্রতি বছর অস্থায়ী মেরামত, দায়সারা সংস্কার এবং শেষ মুহূর্তের তৎপরতা - এই চক্র ভাঙতে হবে। হাওর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি, প্রকৌশলভিত্তিক ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা জরুরি। শুধু মাটি ফেলে বাঁধ উঁচু করলেই হবে না; নদীর গতিপ্রকৃতি, পানির চাপ, উজানের ঢলের পরিসংখ্যান - সব বিবেচনায় এনে স্থায়ী সমাধান দরকার। কই সঙ্গে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। যে প্রকল্পে কাজ অসম্পূর্ণ, যে ক্লোজারে ঝুঁকি রয়ে গেছে, তার দায় নির্ধারণ করতে হবে স্পষ্টভাবে।
হাওর মানেই শুধু ভৌগোলিক এলাকা নয়; এটি সুনামগঞ্জের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষকজীবনের ভিত্তি। সময় ফুরিয়ে আসছে। এখন যদি সমন্বিত ও কঠোর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে একটি অকাল বন্যাই মুছে দিতে পারে বছরের সঞ্চিত স্বপ্ন।
কাগজে শতকরা অগ্রগতি দিয়ে নয়, বাস্তবে টেকসই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমেই হাওরবাসীর আস্থা ফেরাতে হবে। দায়িত্বশীলদের কাছে এখন একটাই প্রত্যাশা- প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর সুরক্ষা।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়